করোনাভাইরাস: আমরা কী জানি আর কী কী জানি না

Corona-Virus
২০১৯ সালের শেষ থেকে হঠাৎই শিরোনামে উঠে এসেছে করোনাভাইরাস। যার নাম দেওয়া হয়েছে ২০১৯ নভেল করোনাভাইরাস (2019-nCoV)। চিনের উহান থেকেই এই মারণ ভাইরাসের উৎপত্তি হয়েছে। শুধু চিনেই নয়, অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস। রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে যে, খুবই অল্প সময়ের মধ্যেই দ্রুত সংক্রামিত হচ্ছে এই ভাইরাস। ফলে আক্রান্তের সংখ্যাও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। চিন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র তথ্য বলছে, চিনে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসের ২০০০ নতুন কেস এসেছে। আর সারা বিশ্বে এখনও পর্যন্ত এই পরিসংখ্যানটা প্রায় ৯৮০০।

করোনাভাইরাসের বিষয়ে আসা তথ্য়ের এত বদল হচ্ছে যে, কেউই বুঝে উঠতে পারছেন না যে, এটা নিয়ে ঠিক কতটা চিন্তিত হওয়া জরুরি। তবে আমরা এই বিষয়ে এখানে একটা মোটামুটি ধারণা দিতে পারি। তবে হয়তো এখনও এই মারণ ভাইরাসের ব্যাপারে অনেক কিছুই জানা যায়নি। আরও তথ্য পাওয়ার জন্য স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা একযোগে কাজ করছেন।

করোনাভাইরাস কী?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অসুস্থতার কারণ হিসেবে দায়ী যে সব ভাইরাস, তার একটা বড় শ্রেণিতে পড়ে এই করোনাভাইরাস (CoV)। এই শ্রেণির ভাইরাস থেকে সাধারণ সর্দি-হাঁচি-কাশিও হতে পারে, আবার নিউমোনিয়াও। এই ভাইরাসের অন্যতম প্রধান উপসর্গ হল- একটানা সর্দি-কাশি ও বুকে কফ জমে থাকা। সাধারণত কোনও ওষুধে এই সমস্যা না সারলে ‘পিসিআর’ বা পলিমারেস চেন রিঅ্যাকশন পরীক্ষা করে এই ধরনের ভাইরাসের উপস্থিতি খোঁজা হয়। এর কারণে সর্দি-কাশি দ্রুত বাড়ে ও প্রবল জ্বর হয়। সঙ্গে শ্বাসকষ্টও থাকে। নাক থেকে জল পড়া, বুকে কফ জমে যাওয়া, মাথা যন্ত্রণা, গলাব্যথা- এগুলিও এর লক্ষণ। তা বাড়তে বাড়তে নিউমোনিয়া, এমনকী সিভিয়ার নিউমোনিয়া পর্যন্ত হতে পারে। তবে এই নভেল করোনাভাইরাস (nCoV) আগে কখনও মানুষের দেহে চোখে পড়েনি।

করোনাভাইরাস সংক্রামক অর্থাৎ সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে পশুদের থেকে বাকিদের মধ্যে এটা ছড়ায়। সাম্প্রতিক এক গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে, সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিন্ড্রোম বা SARS-CoV মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে ভাম বিড়ালের মাধ্যমে। আর মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোম বা MERS-CoV আসে মানুষ বহনকারী উটদের থেকে। কিছু কিছু করোনাভাইরাস ছড়াচ্ছে পশুদের মধ্যে, তবে তা এখনও মানুষের মধ্যে সংক্রামিত হয়নি।

করোনাভাইরাসের সাধারণ উপসর্গ কী কী?

এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে যে লক্ষণ দেখা যায়, তা হল- জ্বরের সঙ্গে কাশি। অনেক ক্ষেত্রে আবার শ্বাসকষ্টও এর উপসর্গ হতে পারে। তা ছাড়াও বমি, গা-গোলানো অথবা ডায়েরিয়ার মতো উপসর্গও দেখা যায়। যদিও অনেকেই আক্রান্ত হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই সেরে উঠেছেন। তবে বয়স্ক, অথবা বাচ্চারা এবং যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাঁদের আরও গুরুতর সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সে ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া অথবা ব্রঙ্কাইটিস হতে পারে।

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে অথবা চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক কি কার্যকর?
একেবারেই না। অ্যান্টিবায়োটিক কখনওই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে না। শুধুমাত্র ব্য়াকটেরিয়াই প্রতিরোধ করতে পারে। নতুন এই করোনাভাইরাস তো আসলে এক ধরনের ভাইরাস, যেটাকে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে প্রতিরোধ করা যায় না। তবে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে আপনাকে অ্য়ান্টিবায়োটিক দেওয়া হতেই পারে, যাতে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ না হয়।

কী ভাবে এর চিকিৎসা করা হয়?

বিজ্ঞানীরা এই ভাইরাসটিকে বোঝার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে আপাতত করোনাভাইরাসের কোনও অ্যান্টিভাইরাল পাওয়া যায়নি। এই ভাইরাসে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে স্পেশ্যালাইজড আর ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের এক্সটেনসিভ কেয়ার জীবন বাঁচিয়ে দিতে পারে।

আপনার বাড়ির পোষ্যদের থেকে কি করোনাভাইরাস ছড়াতে পারে?

বাড়ির কুকুর, বিড়ালের মধ্যে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কোনও নমুনা পাওয়া যায়নি। তবে বাড়ির পোষ্যদের আদর করার পর ভাল করে হাত ধোওয়াই শ্রেয়। কারণ অনেক সময় বাড়ির পোষ্যদের থেকে সালমোনেলা আর ই.কোলাই-এর মতো কিছু সাধারণ ব্যাকটেরিয়া মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। পোষ্যকে আদরের পর হাত ধুলে সেই সম্ভাবনা রুখে দেওয়া যায়।

এই ভাইরাসে কি আপনিও আক্রান্ত হতে পারেন?

ধরে নিন, উহান থেকে আসা কোনও ব্য়ক্তির শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। তবে সেই ব্যক্তির সংস্পর্শে আপনি নেই, সে ক্ষেত্রে আপনার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যাঁরা উহানে রয়েছেন, তাঁরাই এই ভাইরাসে আক্রান্ত। পাশাপাশি, তাঁদের পরিবারের সদস্যদের শরীরেও করোনাভাইরাসের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে। ৩০ জানুয়ারি মানে বৃহস্পতিবার ভারতে প্রথম করোনাভাইরাসের পজিটিভ কেস ধরা পড়েছে। এই আক্রান্ত ভারতীয় উহান বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া। আপাতত কেরলের একটি হাসপাতালে আইসোলেশনে রয়েছেন তিনি।

আসলে এই ভাইরাস কী ভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, সেটা এখনও ঠাহর করা যাচ্ছে না। তবে মনে করা হচ্ছে, সাধারণত করোনাভাইরাসের উপস্থিতি মিলেছে, এমন কারওর হাঁচি-কাশির মাধ্যমে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। আর এটা এক জনের দেহ থেকে আর এক জনের দেহে খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়ছে। অনেকের মলেও আবার কিছু কিছু করোনাভাইরাসের উপস্থিতি টের পাওয়া গিয়েছে। তবে মুখ-চোখের সংস্পর্শ থেকে আদৌ এই রোগ ছড়ায় কি না, তা এখনও নিশ্চিত করে বলা যায়নি।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ রুখতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ:
হ্যান্ড ওয়াশ, সাবান আর জল দিয়ে সব সময় ভাল করে হাত ধুতে হবে।
নাক-মুখ ভাল করে ঢেকে নিতে হবে টিস্য়ু দিয়ে। ব্যবহারের পরে সঙ্গে সঙ্গে ওই টিস্য়ু ফেলে দিতে হবে।
কনুইয়ের ভাঁজে মুখ ঢেকে নিয়ে হাঁচি-কাশি দেওয়া উচিত। আর তার পরেই হাত ধুয়ে নিতে হবে।
যার জ্বর-কাশি হয়েছে, তার থেকে একটু দূরত্ব বজায় রাখুন।
জ্বর-কাশি অথবা শ্বাসকষ্ট হলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের কাছে যান। কোথায় কোথায় ঘুরেছেন সেটাও খুলে বলতে হবে ডাক্তারবাবুকে।
কোনও রকম সুরক্ষা ছাড়া পশুদের সংস্পর্শে যাবেন না। বিশেষ করে করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে এমন এলাকায়।
কাঁচা অথবা ভাল করে রান্না না করা পশুজাত দ্রব্য় (কাঁচা মাংস, না ফোটানো দুধ)
খাবেন না। এমনকী খাদ্যদ্রব্যে হাত দেওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

যে ভাবে এই ভাইরাস ছড়াচ্ছে, তাতে এবং দেশ-বিদেশে ঘন ঘন যাতায়াতের ফলে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়বে বলেই আশঙ্কা। ভাইরাস যাতে আর বেশি ছড়াতে না পারে, তার জন্য চিন সরকার উহানকে রীতিমতো কোয়ারেন্টাইন করে দিয়েছে। খুব প্রয়োজন না থাকলে চিনে যেতে নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছে বেশ কিছু দেশ। এর পাশাপাশি, যে সব দেশের নাগরিকেরা উহানে রয়েছেন, তাঁদের সরিয়ে নিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার। করোনাভাইরাস প্রসঙ্গে যদি আরও কিছু তথ্য পাওয়া যায়, তা হলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (সিডিসি)-এর তরফে তা জানানো হবে।

Find a Doctor

Search Medica Doctors List

Find